ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণে করণীয় কি?

আমাদের মানব শরীরে সব রকম পুষ্টিগুণের প্রয়োজন।শরীরে যেমন ভিটামিনের প্রয়োজন আছে ঠিক তেমনি প্রয়োজন আছে ক্যালসিয়ামের। যদিও এসব উপাদানগুলি শুধু থাকলেই হবে না সেগুলো সঠিক মাত্রায় থাকা প্রয়োজন। না হলে আমাদের শরীর নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে ।


কালসিয়াম-ঘাটতি


মানবদেহের জন্য ক্যালসিয়াম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। শরীরের প্রায় ৯৯% ক্যালসিয়াম জমা থাকে হার ও দাঁতের গঠনে এবং বাকি এক শতাংশ রক্ত ও পেশী থেকে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ কাজ পরিচালনা করে। দৈনিক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত ১০০০ থেকে ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন হয়।


সূচিপত্রঃ ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হওয়ার কারণ ও প্রতিকার


আরও পড়ুন ঃসহজলভ্য আয়রন সমৃদ্ধ খাবার

ক্যালসিয়ামের ঘাটতির কারণ


শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি বা হাইপোক্যালসেমিয়া প্রধানত অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ ভিটামিন ডি এর অভাব হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে হয়ে থাকে। শিশুকালে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি থাকলে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একাধিক সমস্যা দেখা যায়। আবার কিছু ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণে ক্যালসিয়ামের অভাব হয়। বিভিন্ন শারীরিক প্রক্রিয়ার কারণে এবং ক্যালসিয়ামহীন খাবার খেলে ক্যালসিয়ামের অভাব হয়। একাধিক হরমোনের তারতম্যের কারণেও মহিলাদের শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব দেখা যায়।

অতিরিক্ত ব্যায়ামের কারণে ক্যালসিয়ামের অভাব হতে পারে যেখানে হালকা ব্যায়াম করলে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বজায় থাকে। ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণের প্রক্রিয়াটিকে সহজ করে তোলে।যদি ভিটামিন ডি এর ঘাটতি থাকে তবে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি নিজে থেকে শুরু হয়।প্রচুরপরিমাণে সফট ড্রিঙ্ক পান করলে, শরীর দুর্বল হলে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয়।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের মত অবস্থা বা থাইরয়েড রোগ শরীরে  ক্যালসিয়াম শোষণে হস্তক্ষেপ করতে পারে বা শরীর থেকে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি বাড়াতে পারে। ক্যালসিয়াম বিপাক বা শোষণকে প্রবাহিত করে এমন বিরল জিনগত অবস্থার ফলে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হতে পারে। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বিশেষ করে মেনোপজ বা গর্ভাবস্থায় ক্যালসিয়ামের মাত্রা প্রভাবিত করতে পারে।


ক্যালসিয়াম ঘাটতির লক্ষণ

ক্যালসিয়ামের ঘাটতি সব সময় শুরুতেই বোঝা যায় না।অনেক সময় শরীরের ছোটখাট কিছু পরিবর্তনে প্রথম ইঙ্গিত দেয় ।তাই শরীরের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি আছে কিনা বুঝতে লক্ষন গুলো খেয়াল করতে হবে। রক্তে ক্যালসিয়াম কমে গেলে প্রথমদিকে যে সমস্যা দেখা দিতে পারে তার মধ্যে রয়েছে পেশিতে ব্যথা,টান,পেশী  শক্ত বা দুর্বল মনে হয়, হাঁটা বা নড়াচড়ার সময় হাত-পায়ে ব্যথা,হাতে পায়ে আঙ্গুলে ঝিনঝিনি ,হাত-পা বা মুখে চারপাশে অবশ অবস্থা।

ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে কিছু মানুষের শরীরে অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা দেখা দেয়। পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও একটানা শারীরিক দুর্বলতা ও অলসতা বোধ হয়। একই সাথে মনোযোগের অভাব, অনিদ্রা বা ঘুমের ব্যাঘাত,অতিরিক্ত মানসিক অস্থিরতা ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন কিংবা অহেতুক বিরক্তির মতো মানসিক লক্ষণ প্রকাশ পায়।

ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য ঠিক না থাকলে কিছু মানুষের নখ ত্বক চুলে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে নখ পাতলা বা ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া, নখ সহজে ভেঙে যাওয়্‌ নখ ধীরে বাড়া ত্বক শুষ্ক বা রুক্ষ হওয়া চুল রুক্ষ হওয়া বা চুল পরা দেখা যেতে পারে।দাঁতের এনামেল দুর্বল হয়ে যেতে পারে এতে দাতে ক্যাভিটি বা ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। 

ক্যালসিয়ামের ঘাটতি নির্ণয়

শুধু পেশিতে টান দুর্বলতা বা হাত-পায়ে ঝিমঝিম হলেই ক্যালসিয়ামের ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না।একই ধরনের লক্ষণ অন্য অনেক সমস্যাতেও হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে রক্তের ক্যালসিয়ামের মাত্রা নির্ণয় করেন।

কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তার রক্তে ক্যালসিয়ামের ঘাটতির কারন পরীক্ষা করে দেখেন। পরীক্ষাগুলো হল ক্যালসিয়াম টেস্ট যার রক্তে মোট ক্যালসিয়ামের মাত্রা কত আছে তা জানায়।আয়োনাইজড ক্যালসিয়াম টেস্ট যা রক্তে শরীরে জন্য সক্রিয় ক্যালসিয়ামের মাত্রা সরাসরি মাপে। ভিটামিন ডি এর টেস্ট যা শরীরে কালসিয়ামের মাত্রা জানায়, যা ক্যালসিয়াম শোষণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।   


ক্যালসিয়াম-ঘাটতি


মহিলাদের মধ্যে ক্যালসিয়ামের অভাবের লক্ষণ

মহিলাদের মধ্যে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি ভঙ্গুর হাড় এবং অস্ট্রিওপরোসিস এর ঝুঁকি আনে।যদিও হাড় সম্পর্কিত হয় ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্যালসিয়ামের ঘাটতি বুঝতে পারেন না। সাধারণত যেসব মহিলার বয়স ৪৫থেকে ৫০ এর মধ্যে বা উর্ধ্বে অথবা যারা মেনোপজের কাছাকাছি তাদের মধ্যে ইস্ট্রোজেন উৎপন্নের হার কমে যায়।ইস্ট্রোজেন ক্যালসিয়ামের বিপাক ও শোষণের সাহায্য করে।

মহিলাদের মধ্যে ক্যালসিয়ামের অভাবের লক্ষণগুলো হল পিঠে ব্যথা কোমরে ব্যথা হাটুতে ব্যাথা ক্লান্তি বেশিটা বা খিঁচুনি। কিছু ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণেও মহিলাদের ক্যালসিয়ামের অভাবের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন জন্ম নিয়ন্ত্রণের ইনজেকশন,এন্টি সাইকোটিক ড্রাগ ,ক্যান্সার কেমোথেরাপি ড্রাগস ইত্যাদি ।


কিভাবে ঘাটতি মেটাবেন

শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব দূর করার সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ উপায় হলো সুষমা খাবার খাওয়া। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন ,পরিমিত রোদ পোহান।প্রতিদিন সকালে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রোদে থাকুন যা ভিটামিন ডি তৈরি করে এবং শরীরকে ক্যালসিয়াম শোষণ করতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত যা কফি খাওয়া কমান ।কারণ এগুলো ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়।

ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন দুধ,টক দই এবং পনির ক্যালসিয়ামের প্রধান ও  সহজলভ্য উৎস, সবুজ শাকসবজি যেমন ব্রকলি,পুঁই শাক ও অন্যান্য গারো সবুজ শাকসবজি ,ছোট মা্‌ নরম কাঁটা সহ ছোট মাছ যেমন মলা ঢেলা মাছ এবং সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদি ক্যালসিয়ামের খুব ভালো উংস।

খাদ্য দিয়ে ঘাটতি পূরণ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি খেতে হবে। দিনের বেলা ক্যালসিয়াম কম পরিমাণে খাওয়া উচিত। ক্যালসিয়াম পূরণের জন্য ভিটামিন যুক্ত করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন পরিপূরক গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়। বাজারে প্রচুর পরিপূরক পাওয়া যায়।তবে এটি নির্বাচন করা খুব কঠিন এজন্যই রোগীর প্রয়োজনঅনুযায়ী চিকিৎসক বিভিন্ন পরিপূরক দিতে পারেন।

আরো পড়ুন ঃহাড়ের ক্ষয় রোধে করনীয় কী?

কি পরিমাণ ক্যালসিয়াম প্রয়োজন

একজন ব্যক্তির দৈনিক প্রস্তাবিত ক্যালসিয়াম গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণের বয়স হলো প্রধান বিষয়। ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের প্রতিদিন প্রায় ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া উচিত যেখানে ৭ থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুদের দৈনিক ১৫০০ মিলিগ্রাম খাবার প্রয়োজন হবে। এক থেকে আট বছর বয়সে শিশুদের ২৫০০ মিলিগ্রাম হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় যেখানে ৯ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের প্রতিদিন ৩০০০ মিলিগ্রাম খাওয়া উচিত।

বিশেষ অবস্থার জন্য একটি ভিন্ন প্রয়োজন হতে পারে উদাহরণস্বরূপ, গর্ভবতী মহিলাদের প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫০০ মিলিগ্রাম খাওয়া উচিত তাদের বয়স যতই হোক না কেন।একজন গর্ভবতী নারী  যাকে পরবর্তীতে বুকের দুধ খাওয়াতে হতে পারে প্রতিদিন ৩ হাজার মিলিগ্রাম ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন হবে।


ক্যালসিয়াম-ঘাটতি

ক্যালসিয়ামের ঘাটতি কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। তাই ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হওয়ার আগে কিভাবে ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করা যায় সেটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। কিছু ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অবশ্যই রাখতে হবে।

ক্যালসিয়াম পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হল ডায়েটে বিভিন্ন ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা।ক্যালসিয়ামের সেরা উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে দুধ,পনির এবং দইয়ের মতো দুগ্ধ জাত পণ্য। কারণ এগুলো সহজেই শোষণযোগ্য ক্যালসিয়াম।দুধকে ক্যালসিয়ামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয় ।দুধ শুধু ক্যালসিয়ামে দেয় না ভিটামিন এ এবং ভিটামিন ডি ও দেয়। দুধ সহজে শোষিত হয় এবং দুধে উপস্থিত ক্যালসিয়ামের শরীর সহজে শোষণ করতে পারে।

প্রতি ১০০ গ্রাম পনিরে প্রায় ৪৮০ থেকে ৪৯০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড বা ক্যালসিয়াম সালফেট দিয়ে তৈরি পনিরের ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে। মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি পনির বিশেষভাবে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ।

আরও পড়ুনঃ আয়রন এর ঘাটতি হলে কী হয়

আমাদের শেষ কথা

আমরা জানি স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল। তাই স্বাস্থ্য ভালো রাখতে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ক্যালসিয়াম সহ সকল খনিজ উপাদান সঠিক পরিমাণে রাখা উচিত। ক্যালসিয়াম আমাদের হাড় ও দাঁত গঠনে ভূমিকা পালনের পাশাপাশি পেশীয় স্নায়ুর সঠিক কার্যকারিতায় প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাই ক্যালসিয়ামের ঘাটতিকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয় ক্যালসিয়ামের ঘাটতির লক্ষণ দেখা দিলে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন।

আমাদের সাথে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ।যদি আপনি এই ধরনের স্বাস্থ্য সম্পর্কিয় গুরুত্বপূর্ণ ও তথ্যমূলক আর্টিকেল নিয়মিত পড়তে চান তাহলে আমাদের ওয়েবসাইট ফলো করতে থাকুন। কারণ আমরা আমাদের ওয়েবসাইটে নিয়মিত এই ধরনের আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকি।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ফিটনেসঅরা২৪.কম নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url